সুন্নত, বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের এক অনন্য সমন্বয় মেসওয়াক

 

সুন্নত, বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের এক অনন্য সমন্বয় মেসওয়াক

মো. আরিফ উল্লাহ

 


আধুনিক সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যসচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে নানা ধরনের কৃত্রিম স্বাস্থ্যপণ্যের ব্যবহার। দাঁতের যত্নেও আজ বাজারে নানান ধরনের টুথব্রাশ, টুথপেস্ট ও মাউথওয়াশ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব আধুনিক উপকরণের প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার বছর আগেই ইসলাম এমন একটি প্রাকৃতিক ও কার্যকর মুখগহ্বর পরিচর্যার পদ্ধতি উপহার দিয়েছিল, যার নাম মেসওয়াক। দীর্ঘদিন এটি কেবল ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক গবেষণা মেসওয়াকের স্বাস্থ্যগত গুরুত্বকেও নতুন করে মানুষের কাছে তুলে ধরেছে আর মানুষও এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে এটি এখন শুধু সুন্নতের অনুশীলন নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার আলোচনায়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়স্তুতে পরিণত হয়েছে।

 

মেসওয়াক সাধারণত আরাক (Salvadora persica) গাছের ডাল থেকে তৈরি করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিম, জলপাই বা অন্য কিছু গাছের ডালের ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে কিন্তু আরাক গাছের মেসওয়াক সবচেয়ে বেশি গবেষণার আওতায় এসেছে। এর আঁশযুক্ত প্রান্ত দাঁত, মাড়ি ও জিহ্বা পরিষ্কার করতে সহায়তা করে, ইসলামে মেসওয়াকের গুরুত্ব অনেক বেশি যা আমরা সহিহ সাদিসে এর প্রমান পাই, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু মেসওয়াক ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ দেননি, বরং নিজের জীবনেও নিয়মিত এর অনুশীলন করেছেন। হযরত হুযাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (সা.) যখন রাতের তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে উঠতেন, তখন সর্বপ্রথম মেসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন। এছাড়াও আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি তাদের প্রত্যেক নামাজের আগে মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।" এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মেসওয়াক ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপ্রাপ্ত সুন্নত, যদিও তা ফরজ করা হয়নি উম্মতের ওপর সহজতার কথা বিবেচনা করে। এমনকি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, নবী (সা.)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি মেসওয়াক ব্যবহার করেছিলেন। যা মুসলিম উম্মাহ এর জন্য এক অনন্য শিক্ষার দৃষ্টান্ত।  

 

ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংশ হিসেবে বিবেচিত। অজু, গোসল, পোশাক ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি মুখের পরিচ্ছন্নতার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ মুখই মানুষের খাদ্য গ্রহণ, কথা বলা এবং সামাজিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। মুখের দুর্গন্ধ বা দাঁতের রোগ শুধু ব্যক্তিগত অস্বস্তিই সৃষ্টি করে না, বরং তা সামাজিক সম্পর্কসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ কারণে ইসলামের স্বাস্থ্যবিধিতে মেসওয়াকের স্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের বিশ্বে দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির রোগ অন্যতম সাধারণ একটি অসংক্রামক স্বাস্থ্যসমস্যা। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, তামাকজাত পণ্য, অনিয়মিত দাঁত পরিষ্কার এবং অপর্যাপ্ত মৌখিক স্বাস্থ্যসেবার কারণে কোটি কোটি মানুষ এসব সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশেও গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই মৌখিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এ প্রেক্ষাপটে মেসওয়াক একটি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী সহায়ক উপায় হতে পারে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বেশ অনেক বছর আগে থেকেই মিসওয়াকের সম্ভাব্য উপকারিতা সম্পর্কে ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করেছে। ১৯৮৬ সালে এবং পরবর্তীতে ২০০০ সালে সংস্থাটি সুপারিশ করে যে, যেসব অঞ্চলে মিসওয়াক ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সেখানে এটিকে সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং কার্যকর মৌখিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার একটি উপায় হিসেবে উৎসাহিত করা যেতে পারে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, আরাক গাছের মেসওয়াকে সিলিকা, ট্যানিন, ক্যালসিয়াম, ফসফেট, স্বল্পমাত্রার ফ্লোরাইড, ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান দাঁতের উপরিভাগ পরিষ্কার রাখতে, মাড়িকে শক্তিশালী করতে এবং মুখগহ্বরে কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি দমনে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া মেসওয়াক ব্যবহারের সময় দাঁত ও মাড়িতে যে যান্ত্রিক ঘর্ষণ সৃষ্টি হয়, তা প্লাক অপসারণে ভূমিকা রাখে এবং লালা নিঃসরণ বৃদ্ধি করে। লালা মুখের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দাঁতের ক্ষয় রোধে সহায়তা করে। আধুনিক দন্তবিজ্ঞানও দাঁতের সুরক্ষায় ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্টের কার্যকারিতা স্বীকার করে। Cochrane Collaboration-এর ২০১৯ সালের এক সিস্টেমেটিক রিভিউতে দেখা যায়, ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট নিয়মিত ব্যবহার করলে দাঁতের ক্ষয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং দাঁতের এনামেল সুরক্ষিত থাকে (Walsh et al., 2019)তাই মেসওয়াককে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা উচিত।

 

আমরা যেখানে ভুল করি তা হচ্ছে মেসওয়াক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম না জানা। যার ফলে মাড়ি বা দাঁতের ক্ষতি হইয়ে থাকে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার, উপযুক্ত দৈর্ঘ্যের মেসওয়াক ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর এর ব্যবহারযোগ্য অংশ কেটে নতুন অংশ বের করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বছরে অন্তত একবার দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। মেসওয়াকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিবেশগত সুবিধা। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকের টুথব্রাশ বর্জ্যে পরিণত হয়, যা পরিবেশের জন্য একটি বাড়তি বোঝা। প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন এবং সহজে পচনশীল হওয়ায় মেসওয়াক পরিবেশবান্ধব একটি বিকল্প। টেকসই জীবনযাপন এবং প্লাস্টিক দূষণ কমানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টার সঙ্গে এ দিকটি বিশেষভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

ধর্মীয় অনুশাসন এবং আধুনিক বিজ্ঞান যখন একই অভ্যাসের উপকারিতার বিষয়ে একমত হয়, তখন সেটিকে কেবল একটি ঐতিহ্য হিসেবে নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। মেসওয়াক তারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এটি আমাদের শেখায় যে পরিচ্ছন্নতা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং শারীরিক সুস্থতা, সামাজিক শালীনতা এবং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সুন্নতের এই সহজ অনুশীলন যদি সঠিক পদ্ধতিতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তবে তা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, মৌখিক স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষায় একযোগে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সুস্থ দাঁত, সুস্থ মাড়ি এবং পরিচ্ছন্ন মুখ কেবল একটি হাসির সৌন্দর্য নয়, বরং একটি সুস্থ সমাজ গঠনেরও অপরিহার্য ভিত্তি।

 

মো. আরিফ উল্লাহ,

গবেষক ও কলাম লেখক।

arifcbiu@gmail.com

 

Post a Comment

0 Comments