মাইক্রোপ্লাস্টিকের অদৃশ্য হুমকি ও আমাদের করণীয়

 



মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। এগুলো দুইভাবে তৈরি হয়। প্রথমত, কিছু শিল্পপণ্য ও প্রসাধনীতে শুরু থেকেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের মোড়ক, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য প্লাস্টিকজাতসামগ্রী সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, তাপ, বৃষ্টি, সমুদ্রের ঢেউ ও ঘর্ষণের ফলে ধীরে ধীরে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণেই পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু নদী বা সমুদ্রে সীমাবদ্ধ নেই। Leslie et al. (2022)-এর গবেষণায় মানুষের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়, সুতরাং এটি মানুষের শরীরেও পৌঁছে গেছে। খাদ্য, পানীয় পানি এবং বাতাসের মাধ্যমে প্রতিদিন অজান্তেই আমরা এই ক্ষুদ্র কণাগুলো গ্রহণ করছি। সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, ঝিনুক, সমুদ্রের লবণ, বোতলজাত পানি, কলের পানি, চাল, আটা, দুধ, চা, মধু, এমনকি কিছু ফল ও সবজিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের গবেষণায়ও বাজারে বিক্রি হওয়া চাল, আটা, দুগ্ধজাত পণ্য এবং অন্যান্য খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন হলো, এগুলো খাবারে আসে কীভাবে? উত্তরটি আমাদের পরিবেশেই লুকিয়ে আছে। নদী ও সমুদ্রে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী খাদ্য ভেবে এগুলো খেয়ে ফেলে। কৃষিজমিতে দূষিত পানি, প্লাস্টিক মালচিং, বায়ুবাহিত কণা এবং প্যাকেজিং ব্যবস্থার কারণেও খাদ্যদ্রব্য দূষিত হতে পারে। কসমেটিকস ও টুথপেস্টে দাঁত পরিষ্কার ও পালিশ করার জন্য প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা (মাইক্রোবিডস) ব্যবহার করা হতো, যা মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম উৎস। বর্তমানে অনেক দেশে এগুলো নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। তবে কিছু টুথপেস্টে এখনো প্লাস্টিকভিত্তিক উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণা আরো উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এনেছে। বিজ্ঞানীরা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা, লিভার, কিডনি এবং মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। কাজাখস্তানের অন্যতম নাজারবায়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডানা ঝাক্সিলিকোভা তিনি জানান, মানুষের প্রায় সব অঙ্গেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। যদিও এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে, তবুও প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যে বিঘ্ন, হৃদ্রোগের ঝুঁকি এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্কের প্রমাণ ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। তবে এ কথা স্পষ্ট করে বলা জরুরি যে, সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্ত করা মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অনেক দেশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ, স্ট্র, কাপ ও কাটলারি নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার, নিরাপদ প্যাকেজিং এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশেও এই সংকট মোকাবিলায় আর দেরি করার সুযোগ নেই। উন্নত দেশগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিক কমাতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করছে, উন্নত পানি পরিশোধন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে, প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করা কমাচ্ছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে এবং নিয়মিত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে।

বাংলাদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমাতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, যেমন প্লাস্টিক ব্যাগ, স্ট্র, কাপ ও অতিরিক্ত প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার সীমিত করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) এবং নিরাপদভাবে নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। শিল্পকারখানার প্লাস্টিক ও বস্ত্রশিল্পের বর্জ্য পরিশোধন করে নদী-খাল ও জলাশয়ে ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং নিয়মিত জলাশয় পরিষ্কার রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কাপড়, পাট, কাগজ ও জৈবভাবে পচনশীল পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়েও কিছু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার না রাখা, কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক প্যাকেজিং এড়িয়ে চলা এবং পরিবেশে প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলা আমাদের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে। যদিও ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়, তবুও এটি বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কোনো ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাচ্ছি, যে পানি পান করছি এবং যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, সেখানে এই অদৃশ্য দূষকের উপস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। তাই এটি শুধু পরিবেশের নয়, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আজ যদি প্লাস্টিক দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মকে আরো বড় মূল্য দিতে হবে। এখনই সময় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়ে একটি প্লাস্টিক-নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

প্রতিষ্ঠাতা, কোস্টাল কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (সিসিডিআরসি)

arifcbiu@gmail.com

"

Post a Comment

0 Comments